একসময় সামাজিক মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি ছিল শখের বিষয়। এখন সেটিই পরিণত হয়েছে বহু বিলিয়ন ডলারের শিল্পে। ২০২৬ সালে এসে ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং শুধু বিনোদন বা ফ্যাশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; সংবাদ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, ভ্রমণ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রচারণাতেও ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রভাব বাড়ছে দ্রুত।
বিশ্বজুড়ে ব্র্যান্ডগুলো এখন টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের বদলে বেশি বাজি ধরছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব ও টিকটকের জনপ্রিয় মুখগুলোর ওপর। ফলে বাড়ছে ইনফ্লুয়েন্সারদের আয়ও। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও মার্কেটিং সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, একজন ইনফ্লুয়েন্সার গড়ে প্রতি পোস্টে ১৯৫ ডলার থেকে ১,৯০০ ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারেন। আর বড় তারকাদের ক্ষেত্রে এই আয় কয়েক লাখ ডলারও ছাড়িয়ে যায়।
ফলোয়ার যত বেশি, আয়ও তত বড়
সাধারণভাবে ইনফ্লুয়েন্সারদের চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়—ন্যানো, মাইক্রো, ম্যাক্রো ও মেগা ইনফ্লুয়েন্সার। ফলোয়ার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে বিজ্ঞাপনী মূল্যও।
২০২৬ সালের গড় হিসাব অনুযায়ী—
- ন্যানো ইনফ্লুয়েন্সার (১ হাজার–১০ হাজার ফলোয়ার) প্রতি পোস্টে আয় করেন প্রায় ১৯৫ ডলার।
- মাইক্রো ইনফ্লুয়েন্সারদের (১০ হাজার–১ লাখ ফলোয়ার) আয় প্রায় ১,২১১ ডলার।
- ম্যাক্রো ইনফ্লুয়েন্সারদের (১ লাখ–১০ লাখ ফলোয়ার) আয় প্রায় ১,৮০৪ ডলার।
- আর মেগা ইনফ্লুয়েন্সার বা সেলিব্রিটিরা প্রতি পোস্টে ৫ হাজার ডলারের বেশি আয় করেন। অনেক ক্ষেত্রে এই সংখ্যা কয়েক লাখ ডলারেও পৌঁছায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন শুধু ফলোয়ার সংখ্যা নয়, দর্শকের সক্রিয় অংশগ্রহণ বা ‘এনগেজমেন্ট রেট’ও বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে কম ফলোয়ার থাকা অনেক কনটেন্ট নির্মাতাও ভালো আয় করছেন।
ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক সবচেয়ে লাভজনক
বর্তমানে ব্র্যান্ড প্রচারণার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক। ছোট ভিডিও বা রিলসের জনপ্রিয়তা বাড়ায় বিজ্ঞাপনদাতারাও ঝুঁকছেন এসব মাধ্যমে।
ইনস্টাগ্রামে ১০ হাজারের কম ফলোয়ার থাকা কেউ প্রতি পোস্টে গড়ে ৮০ থেকে ৯০ ডলার আয় করতে পারেন। ফলোয়ার সংখ্যা ১ লাখের কাছাকাছি হলে আয় দাঁড়ায় প্রায় ২০০ ডলার। আর ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ অনুসারী থাকলে প্রতি পোস্টে ৭,৫০০ ডলার পর্যন্ত আয় সম্ভব।
সেলিব্রিটি পর্যায়ের ইনফ্লুয়েন্সারদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা আরও বিস্ময়কর। ১০ লাখের বেশি অনুসারী থাকলে প্রতি পোস্টে ১০ হাজার ডলার থেকে শুরু করে ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত পারিশ্রমিক নেওয়ার নজির রয়েছে।
অন্যদিকে ইউটিউবের আয়ের কাঠামো কিছুটা ভিন্ন। এখানে শুধু সাবস্ক্রাইবার নয়, ভিডিও কতবার দেখা হয়েছে এবং বিজ্ঞাপন কতটা এসেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ভাইরাল ভিডিও নির্মাতারা একেকটি ভিডিও থেকেই বড় অংকের আয় করতে পারেন।
শুধু স্পনসর পোস্ট নয়, আয়ের পথ আরও বিস্তৃত
ইনফ্লুয়েন্সারদের আয়ের প্রধান উৎস এখনও স্পনসরড পোস্ট। তবে এখন অনেকেই একাধিক উৎস থেকে আয় করছেন।
এর মধ্যে রয়েছে—
- ব্র্যান্ডের পণ্য প্রচারের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ
- অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে কমিশন আয়
- নিজস্ব পোশাক, প্রসাধনী বা ডিজিটাল পণ্য বিক্রি
- ইউটিউব, ফেসবুক বা টিকটকের মনিটাইজেশন সুবিধা
- লাইভ স্ট্রিমিং, সাবস্ক্রিপশন ও ফ্যান ডোনেশন
বিশেষ করে ফেসবুক ও ইউটিউবের বিজ্ঞাপন আয়ের পাশাপাশি ‘স্টারস’, ‘সুপার থ্যাংকস’ বা সাবস্ক্রিপশন মডেল নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে।
বিজ্ঞাপনের বাজার বদলে দিচ্ছেন ইনফ্লুয়েন্সাররা
মার্কেটিং বিশ্লেষকদের মতে, এখন অনেক প্রতিষ্ঠান টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের চেয়ে সামাজিক মাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের বেশি কার্যকর মনে করছে। কারণ, দর্শকের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ ও বিশ্বাসযোগ্যতা তুলনামূলক বেশি।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্কও করছেন। শুধু বড় ফলোয়ার সংখ্যা দেখেই ইনফ্লুয়েন্সার নির্বাচন করলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও মিলতে পারে। এজন্য এনগেজমেন্ট রেট, দর্শকের প্রকৃতি ও কনটেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা জরুরি। সাধারণভাবে ২ শতাংশ বা তার বেশি এনগেজমেন্ট রেটকে কার্যকর ধরা হয়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শর্ট ভিডিও ও লাইভ কমার্সের বিস্তারের ফলে আগামী কয়েক বছরে ইনফ্লুয়েন্সার অর্থনীতি আরও বড় হবে। আর সেই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমের জনপ্রিয় মুখগুলোর আয়ও বাড়তে থাকবে।
