কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শুধু প্রযুক্তি খাতের প্রতিযোগিতা নয়। এটি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান অস্ত্রে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে এআইয়ের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির ওপর নিজের নেতৃত্ব ধরে রাখতে, অন্যদিকে চীন দ্রুত নিজস্ব এআই অবকাঠামো, চিপ ও মডেল তৈরি করে সেই ব্যবধান কমিয়ে আনছে।
ফলে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো বাণিজ্য ও সেমিকন্ডাক্টর যুদ্ধ এখন ঢুকে পড়েছে এআইয়ের কেন্দ্রে।
আসল লড়াইটা কোথায়?
এআই প্রতিযোগিতাকে শুধু কে ভালো চ্যাটবট বানাচ্ছে—এভাবে দেখলে ভুল হবে। আসল প্রতিযোগিতা কয়েকটি স্তরে।
প্রথমত, কম্পিউটিং শক্তি ও চিপ। সবচেয়ে উন্নত এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ শক্তিশালী GPU ও ডেটা সেন্টার প্রয়োজন। এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের বড় সুবিধা। Nvidia-এর মতো মার্কিন কোম্পানির তৈরি উন্নত এআই চিপ এখন বৈশ্বিক এআই অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই জায়গায় চীনকে পিছিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ তৈরির প্রযুক্তি চীনে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে।
কিন্তু এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—চিপ আটকে দিলেই কি চীনকে এআই দৌড় থেকে থামানো যাবে?
সম্ভবত না।
কারণ চীন ইতিমধ্যেই নিজস্ব চিপ, মডেল এবং কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরিতে জোর দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা চীনের উন্নত এআই চিপে প্রবেশাধিকার সীমিত করলেও একই সঙ্গে দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরির চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি: সীমান্ত প্রযুক্তি
যুক্তরাষ্ট্র এখনো এআইয়ের সবচেয়ে উন্নত বা ‘frontier’ স্তরে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। বড় মডেল, উন্নত চিপ, ক্লাউড অবকাঠামো, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিপুল বেসরকারি বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম রয়েছে।
OpenAI, Google, Anthropic, Meta এবং অন্যান্য মার্কিন প্রতিষ্ঠান এই প্রতিযোগিতার সামনের সারিতে।
২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশিত AI Action Plan-এও তিনটি বড় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে—এআই উদ্ভাবন দ্রুত করা, এআই অবকাঠামো তৈরি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নিরাপত্তায় মার্কিন নেতৃত্ব নিশ্চিত করা।
অর্থাৎ ওয়াশিংটনের কাছে এআই এখন জাতীয় অর্থনৈতিক নীতি নয়; এটি জাতীয় শক্তির অংশ।
চীনের শক্তি অন্য জায়গায়
চীন হয়তো এখনো সব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যায়নি। কিন্তু চীনের সুবিধা হলো—দেশটির বিশাল বাজার, বিপুল পরিমাণ শিল্প-উৎপাদন সক্ষমতা, বিপুল ডেটা, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় সমন্বয় এবং দ্রুত প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষমতা।
একটি সাম্প্রতিক Brookings বিশ্লেষণও বলছে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন এআই প্রতিযোগিতা আসলে শুধু মডেলের প্রতিযোগিতা নয়; কম্পিউট, মডেল, গ্রহণযোগ্যতা, ইন্টিগ্রেশন এবং বাস্তব প্রয়োগ—সব ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা চলছে।
এখানেই চীনের কৌশল গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র যদি সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল বানাতে চায়, চীন একই সঙ্গে চেষ্টা করছে এআইকে সবচেয়ে বড় শিল্প-পরিসরে প্রয়োগ করতে।
নতুন অস্ত্র: এআই মডেলের ‘জ্ঞান’ও এখন সম্পদ
এআই যুদ্ধের আরেকটি নতুন ক্ষেত্র হচ্ছে model distillation বা উন্নত মডেল থেকে সক্ষমতা আহরণ।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন এআই মডেলের সক্ষমতা নিজেদের মডেলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। চীন এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এর ফলে এআই মডেলের জ্ঞানও এখন বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের মতো একটি কৌশলগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে।
তাহলে ‘এআই নিরাপত্তা’ কতটা নিরাপত্তা, আর কতটা রাজনীতি?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সাম্প্রতিক সময়ে Anthropic-এর CEO Dario Amodei এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন এবং চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে উন্নত এআই চিপের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সেই অবস্থানকে ‘Cold War’ কৌশলের সঙ্গে তুলনা করেছে।
চীনের বক্তব্য—এ ধরনের নিরাপত্তার যুক্তির আড়ালে প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি—সবচেয়ে উন্নত এআই প্রযুক্তি যদি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে চলে যায়, তাহলে সেটি সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
চীনও এআইয়ের সম্ভাব্য ‘loss of control’ বা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করছে। অর্থাৎ দুই দেশই ঝুঁকি নিয়ে চিন্তিত—কিন্তু কেউই প্রতিযোগিতা থামাতে চাইছে না। (Reuters)
এটাই বর্তমান এআই রাজনীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
সবাই ভয় পাচ্ছে এআইকে। কিন্তু কেউই প্রথমে থামতে চাইছে না।
কে জিতবে?
এ প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে রয়েছে উন্নত চিপ, শীর্ষস্থানীয় এআই গবেষণা, বড় প্রযুক্তি কোম্পানি, বিপুল মূলধন এবং শক্তিশালী ক্লাউড অবকাঠামো।
চীনের সামনে রয়েছে বিশাল শিল্পভিত্তি, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, রাষ্ট্রীয় সমন্বয়, দ্রুত প্রযুক্তি গ্রহণ এবং নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরির প্রবল চাপ।
তাই এটি সম্ভবত এমন কোনো যুদ্ধ নয় যেখানে একজন জিতবে আর অন্যজন হারবে।
