মাত্র এক মাসেরও কম সময়ে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঝড় তুলেছে এক অদ্ভুত নাম — ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি (CJP)। নাম শুনে হাসি পেলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর গভীর হতাশা, বেকারত্বের জ্বালা এবং সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ইনস্টাগ্রামে ২ কোটির বেশি ফলোয়ার, রাস্তায় প্রতিবাদ, সরকারি চাপ এবং মূলধারার রাজনীতিতে তোলপাড় — এই হলো এই আন্দোলনের বর্তমান চিত্র।
সবকিছুর শুরু হয়েছিল একটি বিতর্কিত মন্তব্য থেকে। মে মাসের মাঝামাঝি প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক মামলার শুনানিতে বেকার যুবকদের “ককরোচ” বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এই মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় আগুন ধরিয়ে দেয়। পুনের ৩০ বছর বয়সী রাজনৈতিক কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিস্ট অভিজিৎ দীপক তার এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে লিখে বসেন: “What if all the cockroaches came together?” এই একটি টুইট থেকেই শুরু হয় এক অভূতপূর্ব আন্দোলন।
অভিজিৎ দীপক: ডিজিটাল নেটিভ থেকে আন্দোলনের মুখ
অভিজিৎ দীপক আম আদমী পার্টির (এএপি) সাবেক সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট। বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করা এই তরুণ নিজেকে “অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর” হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শুরুতে এটা ছিল শুধু একটা জোক, কিন্তু এখন এটি লক্ষ লক্ষ যুবকের প্রতিনিধিত্ব করছে। আন্দোলন শুরুর পর তিনি মৃত্যুর হুমকি, অ্যাকাউন্ট ব্লক এবং এমনকি শারীরিক হামলার শিকারও হয়েছেন। জয়পুরে এক র্যালিতে তাঁর ওপর চড়াও হয় এক ব্যক্তি — ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
কী চায় ককরোচ জনতা পার্টি?
এটি মূলত একটি ব্যঙ্গাত্মক (স্যাটায়ারিকাল) আন্দোলন, কিন্তু দাবিগুলো একেবারেই বাস্তব। প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
- NEET, CUETসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা।
- যুব বেকারত্ব, শিক্ষা সংস্কার, বিচার ব্যবস্থার সংস্কার এবং ধর্মনিরপেক্ষতা।
তাদের স্লোগান — “আরশোলা মরে না, লড়াই চলবেই”। তেলাপোকাকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে তারা বলছে, আমরা দমিয়ে রাখা যায় না। যোগ দেওয়ার যোগ্যতা হিসেবে তারা মজা করে বলেছে: বেকার হতে হবে, অনলাইনে অনেক সময় কাটাতে হবে এবং ক্ষোভ প্রকাশে দক্ষ হতে হবে।
দ্রুত উত্থান এবং রাস্তায় নামা
১৬ মে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট @cockroachjantaparty দ্রুত ২ কোটির বেশি ফলোয়ার অর্জন করে। লক্ষাধিক সদস্য নিবন্ধন হয়। দিল্লির যন্তরমন্তরে বড় সমাবেশ হয়, পুনে ও অন্যান্য শহরেও প্রতিবাদ চলছে। অভিজিৎ দেশে ফিরে যন্তরমন্তরে আম্বেদকরের জীবনী হাতে নিয়ে প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেন।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে এটাকে “পাকিস্তানি ষড়যন্ত্র” বা বিদেশি শক্তির ইন্ধন বলে অভিহিত করা হয়েছে। অভিজিৎ অবশ্য পাল্টা জবাব দিয়ে ফলোয়ারদের তথ্য প্রকাশ করেছেন।
সমালোচনা ও বিতর্ক
বিজেপি সমর্থকরা এটাকে বিরোধীদের ট্রোজান হর্স বলছেন। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন — এটি কি আসলেই স্বতঃস্ফূর্ত যুব আন্দোলন, নাকি রাজনৈতিক এজেন্ডা? অভিজিৎ এএপির সাবেক কর্মী হওয়ায় এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। তবে সমর্থকরা বলছেন, এটি শুধু মিম নয়, এটি যুবসমাজের গভীর অসন্তোষের প্রতিফলন।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
এখনো এটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল নয়, তবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। চ্যালেঞ্জ অনেক — সরকারি চাপ, অভ্যন্তরীণ সংগঠন এবং টেকসইতা। তবে এক মাসেই যেভাবে এটি জেন-জি’র মধ্যে সাড়া ফেলেছে, তা দেখিয়ে দিয়েছে যে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে একটা জোকও জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।
ভারতের রাজনীতিতে “ককরোচ” এখন আর শুধু অপমান নয় — এটি এক শক্তিশালী প্রতীক। অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে এই আন্দোলন কতদূর যাবে, সময়ই বলে দেবে। কিন্তু একটা কথা নিশ্চিত: তেলাপোকারা যখন এক হয়, তখন সিস্টেমকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
(তথ্যসূত্র: বিবিসি, দ্য হিন্দু, এবিপি, আনন্দবাজার, উইকিপিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়া রিপোর্ট।)
