পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সিনেমায় একসময় নিয়মিত দেখা যেত অভিনেত্রী রাইমা সেনকে। ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয়, স্বাভাবিক অভিনয়শৈলী এবং পর্দায় তাঁর উপস্থিতি তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখে পরিণত করেছিল। তবে গত কয়েক বছরে বাংলা সিনেমা বা ওয়েব সিরিজে তাঁকে তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে। হিন্দি সিনেমা ও সিরিজে মাঝেমধ্যে কাজ করলেও বাংলায় দীর্ঘ সময়ের বিরতি নিয়েছিলেন তিনি।
এবার সেই বিরতি ভেঙে আবার বাংলা পর্দায় ফিরেছেন রাইমা সেন। চলতি বছরের জুনে তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর সামনে আসছে নতুন কাজ। অভিনেত্রীকে দেখা যাবে জনপ্রিয় ‘একেন বাবু’ ফ্র্যাঞ্চাইজির নতুন সিনেমা ‘দ্য একেন: কেরালায় কুরুক্ষেত্র’-এ। নতুন এই কাজকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আগ্রহ—এতদিন কোথায় ছিলেন রাইমা? কেন বাংলা সিনেমায় নিয়মিত দেখা যায়নি তাঁকে?
ভালো কাজের অপেক্ষাতেই দীর্ঘ বিরতি
বাংলা সিনেমা থেকে দূরে থাকার কারণ হিসেবে ব্যক্তিগত কোনো সংকটের কথা জানাননি রাইমা। বরং তাঁর বক্তব্য, গত কয়েক বছরে তাঁর পছন্দমতো ভালো প্রকল্পের প্রস্তাব খুব বেশি আসেনি।
পশ্চিমবঙ্গের গণমাধ্যম ‘এই সময়’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী জানিয়েছেন, একই ধরনের চরিত্র বা গল্পে বারবার কাজ করতে তিনি আগ্রহী নন। তাঁর কাছে নতুন কাজের ক্ষেত্রে চরিত্রের বৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাইমার ভাষায়, যে কাজের প্রস্তাব আসছে, তাতে নতুনত্ব থাকা প্রয়োজন। একই ধরনের গল্প বা চরিত্রের প্রস্তাব পেলে তিনি কাজ করতে চান না। এখন কোনো প্রকল্পে যুক্ত হলে এমন কিছু করতে চান, যেখানে দর্শক তাঁকে নতুনভাবে দেখতে পাবেন।
অভিনেত্রীর এই অবস্থান থেকেই বোঝা যায়, দীর্ঘ বিরতিকে তিনি শুধুই কাজের অভাব হিসেবে দেখছেন না। বরং নিজের অভিনয়জীবনে নতুন কিছু শেখা ও নতুন ধরনের চরিত্রে নিজেকে পরীক্ষা করার সুযোগ হিসেবেও দেখছেন।
কমেডি থেকে গ্যাংস্টার—নতুন চরিত্রের খোঁজে রাইমা
অভিনেত্রী জানিয়েছেন, এখন তিনি নিজেকে ভিন্নধর্মী চরিত্রে দেখতে চান। বিশেষ করে এমন চরিত্র, যেগুলো তাঁর আগের কাজের সঙ্গে খুব বেশি মেলে না।
কমেডি চরিত্র থেকে শুরু করে গ্যাংস্টার কিংবা সিনেমার পুলিশের মতো চরিত্রেও আগ্রহ রয়েছে তাঁর। এমনকি প্রচলিত ধারার বাইরে একেবারে ‘আউট অব দ্য বক্স’ কোনো চরিত্র পেলেও তিনি আগ্রহী।
রাইমার কাছে অভিনয়ের অন্যতম আকর্ষণ হলো নতুন কিছু শেখা। তাই শুধু নিয়মিত পর্দায় উপস্থিত থাকার জন্য কাজ করার চেয়ে, এমন চরিত্রে অভিনয় করাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি, যা একজন অভিনেতা হিসেবে তাঁকে চ্যালেঞ্জ করবে।
এই কারণেই হয়তো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁর কাজের সংখ্যা তুলনামূলক কম। তবে পর্দায় ফিরে এলে দর্শক যেন তাঁকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারেন—সেই দিকেই এখন বেশি মনোযোগ তাঁর।
অভিনয়ের বাইরে নিজেকে প্রস্তুত করছেন
দীর্ঘ সময় কোনো সিনেমা বা সিরিজে নিয়মিত অভিনয় না করলেও রাইমা বসে ছিলেন না। বরং অভিনয়ের পাশাপাশি নিজেকে আরও প্রস্তুত করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গের আরেক গণমাধ্যম ‘সংবাদ প্রতিদিন’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাইমা জানিয়েছেন, তিনি নিয়মিত ওয়ার্কশপে অংশ নেন। পাশাপাশি বই পড়েন এবং বিশেষ করে বড় অভিনেতাদের আত্মজীবনী পড়তে আগ্রহী।
বর্তমানে তিনি অ্যান্টনি হপকিন্সের আত্মজীবনী পড়ছেন বলেও জানিয়েছেন।
অভিনেত্রীর মতে, একজন শিল্পীর নিজেকে নিয়মিত আপডেট রাখা জরুরি। কারণ সময়ের সঙ্গে অভিনয়ের ধরন, দর্শকের রুচি এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের ভাষা বদলে যাচ্ছে। ফলে যে অভিনয় পদ্ধতি দিয়ে কেউ ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, সময়ের সঙ্গে সেটি আর একই রকম থাকে না।
নিজেকে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাই নতুন সিনেমা দেখা, বই পড়া এবং অভিনয়ের কর্মশালায় অংশ নেওয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছেন রাইমা।
বাংলা সিনেমায় ফিরেও নতুন কিছু করতে চান
রাইমার বাংলা সিনেমায় প্রত্যাবর্তন শুধু একটি নতুন সিনেমায় অভিনয় করার ঘটনা নয়। তাঁর বক্তব্যে বরং নিজের ক্যারিয়ারের পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে একটি স্পষ্ট অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তিনি এখন নিয়মিত কাজের চেয়ে ভালো কাজকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান। চরিত্রের আকার বড় না ছোট—তার চেয়ে চরিত্রটি কতটা আকর্ষণীয় এবং তাঁর অভিনয়কে কতটা নতুনভাবে তুলে ধরতে পারবে, সেটিই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
এই জায়গা থেকেই ‘দ্য একেন: কেরালায় কুরুক্ষেত্র’ তাঁর প্রত্যাবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে উঠতে পারে।
‘একেন বাবু’ সিরিজ ও সিনেমাগুলোর নিজস্ব দর্শক রয়েছে। নতুন সিনেমাটিতে রাইমার চরিত্র কী ধরনের, সেটিও দর্শকদের কৌতূহলের অন্যতম বিষয়।
ব্যক্তিজীবন নিয়েও আলোচনায় রাইমা
রাইমা সেনের অভিনয়জীবনের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়েও বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর প্রেম ও বিয়ে নিয়ে নিয়মিতই নানা গুঞ্জন শোনা যায়।
তবে অভিনেত্রী জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনি সিঙ্গেল।
বিয়ে প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থানও বেশ স্পষ্ট। শুধু সমাজের চাপ কিংবা বয়সের কথা মাথায় রেখে বিয়ে করার পক্ষে নন তিনি। বরং এমন একজন মানুষকে তিনি খুঁজছেন, যার সঙ্গে সত্যিই পুরো জীবন কাটানোর ইচ্ছা তৈরি হবে।
রাইমার ভাষ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এমন কাউকে তিনি পাননি, যার সঙ্গে সারা জীবন কাটাতে চান।
অর্থাৎ বিয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক প্রত্যাশার চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ ও মানসিক সংযোগকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এই অভিনেত্রী।
বাংলা সিনেমার বর্তমান অবস্থা নিয়ে রাইমার আক্ষেপ
বাংলা সিনেমা নিয়ে রাইমার বক্তব্যও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। একসময় বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিতি শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ছিল বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর মতে, এখন বাংলা চলচ্চিত্রশিল্প কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিদেশে কাজ করতে গেলে বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছ থেকে বাংলা সিনেমার বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রশ্নও শুনতে হয় বলে জানিয়েছেন রাইমা। তাঁদের সামনে এই পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়াও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে সমালোচনার মধ্যেও তাঁর প্রত্যাশা ইতিবাচক। তিনি চান বাংলা চলচ্চিত্রশিল্প আবার তার আগের গৌরবের জায়গায় ফিরে যাক।
এখানে রাইমার বক্তব্য শুধু একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত আক্ষেপ নয়; বাংলা চলচ্চিত্রের দীর্ঘদিনের দর্শক ও শিল্পীদের মধ্যেও একই ধরনের আলোচনা রয়েছে—কীভাবে বাংলা সিনেমা আবার শক্তিশালী গল্প, অভিনয় ও নির্মাণের মাধ্যমে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে।
কেন রাইমার প্রত্যাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ
রাইমা সেন বাংলা চলচ্চিত্রে এমন একটি সময়ে পরিচিতি তৈরি করেছিলেন, যখন কলকাতার সিনেমায় গল্প ও চরিত্রনির্ভর চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মূলধারার ছবিতেও নতুন ধরনের অভিনয়শিল্পীদের জায়গা তৈরি হচ্ছিল।
ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে তিনি ভিন্ন ধরনের চরিত্রে কাজ করেছেন। বাংলা সিনেমার পাশাপাশি হিন্দি সিনেমা ও ওয়েবভিত্তিক কাজেও তাঁকে দেখা গেছে। ফলে তাঁর অভিনয়জীবন শুধু একটি ভাষা বা একটি মাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর নতুন বাংলা সিনেমায় ফিরে আসার ফলে পুরোনো দর্শকদের মধ্যে যেমন আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তেমনি নতুন প্রজন্মের দর্শকরাও তাঁকে নতুন চরিত্রে দেখার সুযোগ পাবেন।
আর রাইমা নিজেই যখন বলছেন, তিনি এখন এমন চরিত্র চান, যেভাবে দর্শক আগে তাঁকে দেখেননি, তখন তাঁর নতুন কাজের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ে।
সামনে কী চান রাইমা?
দীর্ঘ ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে রাইমা সেনের লক্ষ্য এখন শুধু বেশি কাজ করা নয়। বরং কাজের মধ্যে বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া।
কমেডি, গ্যাংস্টার, পুলিশ কিংবা একেবারে অচেনা কোনো চরিত্র—সবকিছুর প্রতিই তাঁর আগ্রহ রয়েছে। একজন অভিনেতা হিসেবে নিজেকে নতুনভাবে পরীক্ষা করার ইচ্ছাটিই এখন তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম চালিকাশক্তি।
তাই সামনে তাঁকে কতগুলো সিনেমা বা সিরিজে দেখা যাবে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—কী ধরনের চরিত্রে তাঁকে দেখা যাবে।
‘দ্য একেন: কেরালায় কুরুক্ষেত্র’ দিয়ে বাংলা পর্দায় তাঁর নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। এরপর যদি তাঁর পছন্দমতো বৈচিত্র্যময় চরিত্র আসে, তাহলে দীর্ঘ বিরতির পর রাইমা সেনের ক্যারিয়ার আবার নতুন গতিতে এগোতে পারে।
তবে আপাতত অভিনেত্রীর নিজের বক্তব্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তিনি নিয়মিত পর্দায় থাকার জন্য নয়, নতুন কিছু বলার মতো চরিত্রের জন্যই কাজ করতে চান।
দর্শকদের জন্য সেটিই হয়তো তাঁর প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক।