ভারতের রাজনীতিতে বইছে নতুন হাওয়া। দক্ষিণ ভারতের রাজ্য তামিলনাড়ুতে অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া বিজয়ের দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম’কে (টিভিকে) কাছে টানতে বড় ধরনের রাজনৈতিক চাল চেলেছে কংগ্রেস। রাজ্য বিধানসভায় ১০৮টি আসন পাওয়ার পর টিভিকে যখন সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সংকটে পড়েছিল, তখনই দীর্ঘদিনের মিত্র ডিএমকে জোট ছেড়ে বিজয়কে সমর্থনের ঘোষণা দেয় কংগ্রেস। এর নেপথ্যে রয়েছে সুদূরপ্রসারী জাতীয় লক্ষ্য—পুরো ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বিজয়ের সমর্থন আদায় এবং তাকে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’তে (INDIA) শামিল করা।
শনিবার এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা পি চিদাম্বরমের বক্তব্যে সেই ইঙ্গিতই স্পষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি আশা করি ডিএমকে ইন্ডিয়া জোটে থাকবে এবং টিভিকেও এই জোটে যোগ দেবে।”
তামিলনাড়ুতে বিজয়ের জয়যাত্রা প্রবল নাটকীয়তার পর শনিবার বিজয় ১২০ জন বিধায়কের সমর্থনপত্র রাজ্যপাল আর. ভি. আরলেকারের কাছে জমা দেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ১১৮টি আসনের প্রয়োজন থাকলেও বিজয়ের ঝুলিতে এখন তার চেয়ে দুটি আসন বেশি। ফলে রবিবার সকালে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন বিজয়। ডিএমকে-র সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে জেতা কংগ্রেসের ৫টি আসনের সমর্থনই বিজয়ের এই মসনদে বসা নিশ্চিত করেছে।
ডিএমকে-র তোপ ও জোটের ভবিষ্যৎ কংগ্রেসের এই পদক্ষেপকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছে এম কে স্ট্যালিনের ডিএমকে। এই ভাঙনের ফলে জাতীয় রাজনীতিতে ইন্ডিয়া জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। তবে চিদাম্বরম মনে করেন, রাজ্য পর্যায়ের বিচ্ছেদ জাতীয় জোটে প্রভাব ফেলবে না। তিনি বলেন, “ডিএমকে প্রধান স্ট্যালিন ইন্ডিয়া জোট নিয়ে একটি শব্দও খরচ করেননি। তিনি শুধু বলেছেন কংগ্রেস ও ডিএমকে-র পথ আলাদা হয়েছে।”
চিদাম্বরম উদাহরণ টেনে বলেন, কেরালায় সিপিআই এবং সিপিএম কংগ্রেসের ঘোর বিরোধী হলেও দিল্লি বা জাতীয় পর্যায়ে তারা একই জোটের অংশ। এমনকি বাংলাতেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইন্ডিয়া জোটকে শক্তিশালী করার কথা বলেছেন। তাই স্ট্যালিন এবং বিজয় উভয়কেই এই জোটে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী কংগ্রেস।
ক্ষুব্ধ স্ট্যালিন শনিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এম কে স্ট্যালিন। তিনি অভিযোগ করেন, বিজয়কে সমর্থন দেওয়ার আগে কংগ্রেস তার সঙ্গে কোনো আলোচনাই করেনি। তিনি লেখেন, “জোটের হয়ে জেতা কংগ্রেস বিধায়করা সৌজন্যমূলক ধন্যবাদ জানাতেও আন্না আরিবালয়ামে আসেননি। উল্টো সেদিনই ডিএমকে-র সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে তারা এগিয়ে গেছে।” তবে বামপন্থি দল এবং ভিসিকে (VCK) নেতারা ডিএমকে-র পাশেই আছেন বলে জানান তিনি।
বিশ্লেষণ: কংগ্রেসের তুরুপের তাস যখন বিজয় কংগ্রেসের এই কৌশলী অবস্থানের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে:
১. বিকল্প শক্তির উত্থান: তামিলনাড়ুতে দীর্ঘদিনের ডিএমকে-এআইএডিএমকে বলয় ভেঙে বিজয়ের যে উত্থান ঘটেছে, কংগ্রেস সেখানে শুরুতেই ভাগ বসাতে চাইছে। বিজয়ের মতো একজন জনপ্রিয় তারকাকে পাশে পেলে তরুণ প্রজন্মের ভোটব্যাংক কবজা করা সহজ হবে। ২. বিজেপি বিরোধী ফ্রন্ট: জাতীয় রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপিকে রুখতে হলে দক্ষিণের প্রতিটি আসন গুরুত্বপূর্ণ। ডিএমকে-র সঙ্গে দূরত্ব বাড়লেও বিজয়কে যদি ইন্ডিয়া জোটে আনা যায়, তবে তামিলনাড়ুতে বিরোধী শক্তি আরও সংহত হবে বলে মনে করছে কংগ্রেস হাইকমান্ড। ৩. চাপ সৃষ্টির কৌশল: ডিএমকে-র ওপর জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে বিজয়কে ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে ব্যবহার করছে কংগ্রেস।
তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মিত্র স্ট্যালিনের সঙ্গে যে তিক্ততা তৈরি হলো, তা আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে ইন্ডিয়া জোটের ঐক্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তামিলনাড়ুর এই অভ্যন্তরীণ সমীকরণ শেষ পর্যন্ত ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার লড়াইয়ে কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।