অ্যাপল (Apple) এর হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জন টারনাস (John Ternus) বর্তমানে প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। বিশেষ করে অ্যাপল সিলিকন (M1, M2, M3 চিপ) এবং আইফোনের আধুনিকায়নের পেছনে তাঁর ভূমিকা তাকে কোম্পানির ভবিষ্যৎ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) হিসেবে অন্যতম দাবিদার করে তুলেছে।
প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল যখন তাদের কোনো নতুন পণ্য উন্মোচন করে, তখন মঞ্চে এক দীর্ঘকায়, শান্ত এবং আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিকে প্রায়ই দেখা যায়। তিনি জন টারনাস। স্টিভ জবস বা টিম কুকের মতো তিনি হয়তো খুব বেশি আলোচনায় থাকেন না, কিন্তু আপনার হাতে থাকা আইফোন থেকে শুরু করে ম্যাকবুকের প্রতিটি সূক্ষ্ম কারুকার্য এবং শক্তিশালী পারফরম্যান্সের নেপথ্যে রয়েছে তাঁর মস্তিষ্ক।
জন টারনাস যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি সেখান থেকে বিএস (BS) ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ‘ভার্চুয়াল রিসার্চ সিস্টেমস’ নামক একটি সংস্থায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেছিলেন। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় ২০০১ সালে, যখন তিনি অ্যাপল ইনকর্পোরেটেডে যোগ দেন।
অ্যাপলে কর্মজীবন ও উত্থান
২০০১ সালে অ্যাপলের প্রোডাক্ট ডিজাইন টিমে যোগ দেওয়ার পর থেকে জন তাঁর মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি অ্যাপলের হার্ডওয়্যার বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১৩: তিনি হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে পদোন্নতি পান।
২০২১: ড্যান রিচিও-এর স্থলাভিষিক্ত হয়ে তিনি অ্যাপলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (Hardware Engineering) পদে আসীন হন এবং সরাসরি সিইও টিম কুকের অধীনে কাজ শুরু করেন।
জন টারনাস অ্যাপলের ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল এবং সফল কিছু প্রজেক্টের নেতৃত্ব দিয়েছেন:
অ্যাপল সিলিকন ট্রানজিশন (Apple Silicon)
জন টারনাসের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো ইন্টেল (Intel) প্রসেসর থেকে সরে এসে অ্যাপলের নিজস্ব চিপসেট (M1, M2 সিরিজ) ব্যবহারের প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন করা। এটি ম্যাক কম্পিউটারগুলোকে শক্তির দিক থেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
আইফোন এবং আইপ্যাড
প্রথম প্রজন্মের আইফোন থেকে শুরু করে বর্তমানের আইফোন ১৫ এবং ১৬ সিরিজ পর্যন্ত প্রতিটি মডেলের হার্ডওয়্যার ডিজাইনে তাঁর অবদান রয়েছে। এছাড়াও আইপ্যাড প্রো (iPad Pro) এবং আইপ্যাড এয়ারের আধুনিক রূপান্তরের পেছনেও তিনি মূল কারিগর।
এয়ারপডস (AirPods)
বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ওয়্যারলেস ইয়ারফোন ‘এয়ারপডস’-এর হার্ডওয়্যার ডেভেলপমেন্টে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
অ্যাপল ভিশন প্রো (Vision Pro)
অ্যাপলের সাম্প্রতিকতম বিস্ময় ‘ভিশন প্রো’ স্পেশাল কম্পিউটিং হেডসেট তৈরির ক্ষেত্রেও তাঁর হার্ডওয়্যার টিম অসাধারণ কাজ করেছে।
জন টারনাস তাঁর টিমের কাছে একজন প্রখর মেধাবী এবং স্থিরমস্তিষ্ক নেতা হিসেবে পরিচিত। অ্যাপলের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, জন কারিগরি জটিলতা খুব সহজে সমাধান করতে পারেন। তাঁর নেতৃত্বে হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যারের মধ্যে এক গভীর সমন্বয় তৈরি হয়েছে, যা অ্যাপল পণ্যগুলোকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে।
সিইও (CEO) হিসেবে আলোচিত
আইফোন নির্মাতা বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অ্যাপলের পরবর্তী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে জন টারনাসের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। টিম কুকের উত্তরসূরি হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এই চ্যালেঞ্জিং যুগে কিছুটা পিছিয়ে থাকা অ্যাপলকে নেতৃত্ব দেবেন টারনাস। গতকাল সোমবার প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
জন টারনাস অ্যাপলের হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
অ্যাপল বিবৃতিতে বলেছে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর জন টারনাস আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তবে অ্যাপলের বর্তমান সিইও টিম কুক বিদায় নিচ্ছেন না; তিনি প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে যুক্ত থাকবেন। কুকের ১৫ বছরের নেতৃত্বে অ্যাপলের বাজারমূল্য অবিশ্বাস্যভাবে ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।
জন টারনাস এমন একজন ব্যক্তি যিনি প্রচারের আলোয় থাকার চেয়ে পর্দার আড়ালে কাজ করতেই বেশি পছন্দ করেন। তবে অ্যাপল সিলিকনের অভাবনীয় সাফল্য তাঁকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করে তুলেছে। তিনি যখন কথা বলেন, তখন তাঁর কথায় প্রকৌশলবিদ্যার গভীরতা এবং অ্যাপলের দর্শনের প্রতিফলন ঘটে। ভবিষ্যৎ যাই হোক না কেন, আধুনিক অ্যাপলের ভিত্তি তৈরিতে জন টারনাসের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নেতৃত্বে পরিবর্তন আনল অ্যাপল। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন বিশ্বের সবচেয়ে দামি কোম্পানির তালিকায় শীর্ষে থাকলেও সম্প্রতি সেই জায়গা দখল করেছে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া।
এআইয়ের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ায় বিনিয়োগকারীরা অ্যাপলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। তাঁরা বলছেন, মানুষের কাজ করার ও তথ্য পাওয়ার ধরন বদলে দেওয়া এআই প্রযুক্তিতে অ্যাপল আশানুরূপ উদ্ভাবন করতে পারছে না। প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে সবচেয়ে সফল পণ্য আইফোনে এআই যুক্ত করাই হবে টারনাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
চ্যালেঞ্জ
গত জানুয়ারিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী গুগলের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে অ্যাপল। চুক্তির লক্ষ্য ছিল গুগলের ‘জেমিনি’ এআই চ্যাটবট ব্যবহার করে অ্যাপলের ভার্চ্যুয়াল সহযোগী ‘সিরি’কে আরও উন্নত করা।
২০১১ সালে সিরির মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধারণা সবার আগে সামনে আনলেও এআই প্রযুক্তিতে এখন পর্যন্ত কোনো বড় সাফল্য পায়নি অ্যাপল। বিপরীতে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটির মতো নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীরা বর্তমানে কোটি কোটি গ্রাহককে লুফে নিয়েছে।
প্রযুক্তি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টেকনালিসিস রিসার্চের প্রধান বব ও’ডোনেল বলেন, ‘আমি মনে করি, তাঁর (টারনাস) সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অ্যাপলের জন্য উন্নত মানের এআই সেবা নিশ্চিত করা, যেখানে অন্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অ্যাপল নিজের সক্ষমতাকেই বেশি ব্যবহার করবে।’
টারনাসের বর্তমান বয়স ৫০ বছর। স্টিভ জবসের কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার সময় টিম কুকের বয়সও একই ছিল। অ্যাপল সাধারণত কর্মকর্তাদের জনসমক্ষে কথা বলার সুযোগ কম দিলেও গত কয়েক বছর ধরে টারনাসকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রচারের আলোয় আনা হয়েছে।
টারনাসের সামনে এখন মেটার মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে। অ্যাপলের সাড়ে তিন হাজার ডলারের ভিশন প্রো হেডসেটের তুলনায় মেটার স্মার্ট চশমা অনেক সস্তা ও জনপ্রিয়। এদিকে এনভিডিয়াও ল্যাপটপ চিপ ও নিজস্ব কম্পিউটার নিয়ে কাজ করছে।