চিত্রনায়িকা শামসুন্নাহার স্মৃতি, চলচ্চিত্র অঙ্গনে যিনি পরীমণি নামে পরিচিত, তাঁকে সাত দিনের মধ্যে লিখিতভাবে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণ, এক সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এবং ফেসবুকে অশালীন ভাষায় লেখা একটি পোস্টের পেছনে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করে এ নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার হাসান শাহরিয়ার ডাকযোগে পরীমণিকে এ নোটিশ পাঠান। একই নোটিশের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছেও।
নোটিশে আদালত প্রাঙ্গণে ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য পরীমণিকে সাত দিনের মধ্যে লিখিত ও নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে অশালীন ভাষা ব্যবহার, কাউকে হুমকি দেওয়া, অশোভন অঙ্গভঙ্গি কিংবা আপত্তিকর পরিবেশনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আদালত প্রাঙ্গণে কী ঘটেছিল
আইনি নোটিশের বিবরণ অনুযায়ী, গত ৫ নভেম্বর ঢাকার একটি আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেন পরীমণি। ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা একটি মামলায় আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন।
ওই দিন সকাল আনুমানিক ১১টা ৪০ মিনিটে গাড়ি থেকে নেমে আদালতকক্ষে যাওয়ার সময় সাংবাদিকেরা তাঁর ছবি ও ভিডিও ধারণের চেষ্টা করেন। এ সময় পরীমণির সঙ্গে থাকা নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে সাংবাদিকদের বাগ্বিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে অভিযোগ করা হয়, এ সময় সমকাল-এর মাল্টিমিডিয়া প্রতিবেদক রবিউল হোসেনের মুঠোফোন কেড়ে নেন পরীমণি। তাঁর সঙ্গে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা ওই সাংবাদিকের ভিডিও ধারণের ট্রাইপড ভেঙে ফেলেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন বলে নোটিশে উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে জাগো নিউজের প্রতিবেদক আশিকুজ্জামান, মাল্টিমিডিয়া প্রতিবেদক আবদুল্লাহ আল কাওসার, আগামী সময়ের প্রতিবেদক সিয়াম হোসেন এবং টাইমস টুডের শাহ রিয়াজের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আদালতে আসা সুজন চন্দ্র মণি নামের এক ব্যক্তিও আহত হন বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে।
সাংবাদিককে হত্যার হুমকির অভিযোগ
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, আদালতের কার্যক্রম শেষে বের হওয়ার সময় পরীমণি সমকাল-এর মাল্টিমিডিয়া প্রতিবেদক রবিউল হোসেনের কাছে যান। এ সময় তাঁর সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে পরীমণি ওই সাংবাদিককে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং গাড়িচাপা দিয়ে হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, রবিউল হোসেনের ডান হাতের তিনটি আঙুল নেই। ফলে তাঁর দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্মেও অসুবিধা হয়। এমন একজন সাংবাদিকের সঙ্গে এ ধরনের আচরণের অভিযোগকে পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন নোটিশদাতা আইনজীবী।
তবে এসব অভিযোগ আইনি নোটিশে উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে আদালতের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফেসবুক পোস্টে জাতীয় সংগীত ব্যবহারের অভিযোগ
পরীমণিকে পাঠানো আইনি নোটিশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তাঁর ফেসবুক পোস্ট। নোটিশে বলা হয়েছে, গত ৬ নভেম্বর পরীমণি তাঁর ফেসবুক পেজে অশালীন ভাষা সংবলিত একটি পোস্ট প্রকাশ করেন। ওই পোস্টের পেছনে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আইনজীবীর দাবি, জাতীয় সংগীতের মতো রাষ্ট্রীয় মর্যাদাসম্পন্ন একটি সংগীতকে অশালীন বক্তব্যের সঙ্গে ব্যবহার করা অনুচিত এবং এটি জাতীয় সংগীতের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল হতে পারে।
নোটিশে বাংলাদেশের সংবিধানের ৪ অনুচ্ছেদের ১ উপঅনুচ্ছেদে জাতীয় সংগীতের স্বীকৃতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যানথেম, ফ্ল্যাগ অ্যান্ড এমব্লেম অর্ডার, ১৯৭২ এবং জাতীয় সংগীতবিষয়ক বিধিমালা, ১৯৭৮-এর কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১০ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় সংগীত, পতাকা ও প্রতীকের অবমাননার জন্য শাস্তির বিধান যুক্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
শিল্পী সমিতির কাছেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
আইনি নোটিশে শুধু পরীমণির কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয়নি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
নোটিশে সমিতির সভাপতি শিবা সানু এবং সাধারণ সম্পাদক জয় চৌধুরীকে পরীমণির বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নোটিশ পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে এ পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন নোটিশদাতা আইনজীবী।
পরীমণির বক্তব্য কী
আদালত প্রাঙ্গণের ঘটনার বিষয়ে এর আগে গণমাধ্যমের কাছে নিজের বক্তব্য দিয়েছিলেন পরীমণি। তাঁর দাবি ছিল, আদালতের লিফটে ওঠার সময় একজন ব্যক্তি তাঁর হাতে এমনভাবে ধরেছিলেন, যাতে তিনি ব্যথা পান। ওই ব্যক্তিকে পরে সাংবাদিক রবিউল হোসেন হিসেবে শনাক্ত করেন বলে জানান তিনি।
পরীমণির ভাষ্য অনুযায়ী, লিফটে ওঠার সময় একটি মুঠোফোন ও ট্রাইপড তাঁর চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছিল। তিনি হাত দিয়ে সেটি সরিয়ে দেওয়ার পর কেউ তাঁর হাত ধরে টান দেন বলে তাঁর অভিযোগ।
অন্যদিকে সাংবাদিক রবিউল হোসেন পরীমণির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি লিফটে ওঠার পথে কোনো বাধা সৃষ্টি করেননি এবং পরীমণিকে স্পর্শও করেননি। বরং পরীমণি তাঁর মুঠোফোন সরিয়ে নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে তাঁকে গালিগালাজ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন রবিউল।
দুই পক্ষের বক্তব্যে এভাবে ভিন্নতা থাকায় ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাংবাদিকদের সংগঠনের প্রতিবাদ
আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল রিপোর্টার্স ফোরাম (ডিআরএফ) এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থানে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া, তাঁদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীদের মাধ্যমে হয়রানি করার অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়।
সংগঠনটি ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
নাসির উদ্দিন মাহমুদের মামলায় আদালতে পরীমণি
পরীমণিকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের পেছনে রয়েছে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা একটি পুরোনো মামলা।
প্রথম আলো ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৬ জুলাই ঢাকার আদালতে মামলাটি করেন নাসির উদ্দিন মাহমুদ। তাঁর অভিযোগ, ২০২১ সালের ৯ জুন রাতে সাভারের বোট ক্লাবে পরীমণি ও তাঁর সহযোগীরা ভাঙচুর করেন, তাঁকে মারধর করেন এবং হত্যার হুমকি দেন।
অন্যদিকে ওই ঘটনার পর পরীমণিও নাসির উদ্দিন ও অন্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে সাভার থানায় মামলা করেছিলেন। সেই মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে বলে প্রথম আলো জানিয়েছে।
গত ৪ নভেম্বর নাসির উদ্দিনের করা মামলায় পরীমণির জামিন বাতিল করে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরদিন ৫ নভেম্বর তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন এবং ৫০০ টাকার মুচলেকায় জামিন পান। আদালত থেকে বের হওয়ার সময়ই সাংবাদিকদের সঙ্গে বিতর্কিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
আইনজীবীর বক্তব্য ও পরবর্তী পদক্ষেপ
আইনি নোটিশ পাঠানো আইনজীবী খন্দকার হাসান শাহরিয়ার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন, পরীমণিকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে এবং চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতিকেও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিল্পী সমিতি কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তা দেখার পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জাতীয় সংগীত অবমাননার অভিযোগে সম্ভাব্য আইনি ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করা হলে আদালত আইন অনুযায়ী শাস্তির বিষয় নির্ধারণ করবেন। আপাতত নোটিশে সংশ্লিষ্ট আইনের উল্লেখ করা হয়েছে।
সাংবাদিককে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগে ওই সাংবাদিক চাইলে আলাদাভাবে মামলা করতে পারবেন বলেও জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়ার কথাও বলেছেন আইনজীবী।
এখন কী হতে পারে
পরীমণির কাছে পাঠানো আইনি নোটিশের পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, তিনি সাত দিনের মধ্যে লিখিতভাবে নিঃশর্ত ক্ষমা চান কি না। দ্বিতীয়ত, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেয় কি না। তৃতীয়ত, সাংবাদিকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিষয়ে আলাদা কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না।
এখানে উল্লেখযোগ্য, আইনি নোটিশ পাঠানো মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। নোটিশে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা এবং আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হতে হবে।
এদিকে ৮ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে পরীমণির পক্ষ থেকে নতুন আইনি নোটিশের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করছে।